ব্যবসার শুরু থেকেই ব্র্যান্ডিং কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

আমাদের ব্যবসার শুরু থেকেই ব্র্যান্ডিং এর প্রতি গুরুত্ব দেওয়া দরকার, ভাবতে পারেন ব্র্যান্ডিং বলতে বুঝি অ্যাপেল, গুগল, ম্যকডোনাল্ডস কিংবা দেশের সুপরিচিত কোম্পানি গুলোর জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু ব্যবসায়িক নিমিত্তে, ছোট বা বড় পরিসরে শুরু থেকেই ব্র্যান্ডিং সম্পর্কে ভাবা দরকার।

এদিকে অনেক উদ্যোক্তা ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিং এর মধ্যে পার্থক্য করেন না। ভেবে থাকেন শব্দ দুটি একই। তাই মার্কেটিং নিয়ে কাজ করলেই ব্র্যান্ডিং কাভার হয় বলে মনে করে থাকেন।

আসলে ব্র্যান্ডিং এবং মার্কেটিং দুটি স্বতন্ত্র ধারণা।

ব্র্যান্ডিং দিয়ে বোঝায় একটা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান কেমন? তার নিজস্বতা, সুনাম, অভিজ্ঞতা ও তার প্রতি গ্রাহক বা ক্রেতার প্রত্যাশা। ক্রেতার বিশ্বস্ততা এবং স্বীকৃতির পেছনে চালিকা শক্তি হিসেবে ব্র্যান্ডিং কাজ করে।

অর্থাৎ পণ্য, সেবা ও ব্যবসার ব্যপারে ক্রেতার সহজে মূল্যায়নের একটি ভাল উপায় ব্র্যান্ডিং।

অন্যদিকে মার্কেটিং হল সেলস ও রেভিনিউ বৃদ্ধির কৌশল, নতুন ক্রেতা তৈরি এবং বাজারের আধিপত্য আস্তে আস্তে দখল করার কৌশলী কর্মপন্থা।

তার মানে ব্র্যান্ডিং আপনার ব্যবসায় পরিকল্পনার একটি অংশ। আর মার্কেটিং ব্র্যান্ডের শক্তি বাড়িয়ে ব্যাবসা, পণ্য ও সার্ভিস কে প্রমোট করার সহায়িকা।

ব্র্যান্ডিং আপনার ব্যাবসা চালানোর প্রকৃত সম্পদ। এটি আপনার কোম্পানি সম্পর্কে কাস্টমার বা গ্রাহকের ধারণার প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করবে। আবার প্রতিষ্ঠানকে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে নিতে যে সমস্ত কর্মীরা কাজ করবে সেসব আন্তরিক কর্মী পেতেও ব্র্যান্ডিং সহায়তা করবে। কারণ ভাল ব্র্যান্ডিং হলে কোম্পানির সোশ্যাল ভ্যালু বাড়বে আর তখন মেধাবী ও সৃজনশীল কর্মীরা সেই কোম্পানিতে আসতে আকৃষ্ট হবে। 

তাই ব্যবসায় নতুনত্ব ও সৃজনশীলতা রাখতে, ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে এবং ধাপে ধাপে বড় কোম্পানিতে রূপ দিতে বাজেট পরিকল্পনায় অবশ্যই শুরু থেকেই ব্র্যান্ডিং এ প্রাধান্য দিতে হবে। তবে মার্কেটিং কৌশলে ব্র্যান্ডিংয়ের গুরুত্বকে অতিবৃদ্ধি করা যাবে না। বড় কোম্পানিগুলির ব্র্যান্ডিং এর জন্য বড় বাজেট থাকে। কিন্তু নতুন উদ্যোক্তাদের একটি কার্যকর ব্র্যান্ডিং কৌশল তৈরি করতে শুরুতেই খুব বেশি টাকার প্রয়োজন নেই। তাহলে কী করতে হবে বা কেমন হবে ব্র্যান্ডিং কৌশল?

। প্রথমত: ব্র্যান্ড প্রতিশ্রুতি ।

Branding

আপনার ব্র্যান্ড এর উদ্দেশ্য কি তা নিজের কাছে স্পষ্ট করুন। নিজেকে গভীর কিছু প্রশ্ন করে তার উত্তর ও বিশ্লেষণ থেকে ব্র্যান্ডের সংজ্ঞা বের করুন। যেমন – 

ব্র্যান্ড হিসেবে কোম্পানিকে কোথায় দেখতে চান? 

আপনার পণ্য ও সেবার সমাধান কেমন হবে? 

পণ্যের অনন্য দিক কোনটি? 

কেনইবা ক্রেতা আপনার ব্র্যান্ডকে বেছে নিবে?

অর্থাৎ এখানে ক্রেতা, গ্রাহক এবং ফলোয়ারদের প্রতি আপনার ব্র্যান্ড সম্পর্কে এখানে সামগ্রিক ধারণার অন্তর্ভুক্তিমূলক উপস্থাপন থাকতে হবে। এই ব্র্যান্ড প্রতিশ্রুতি ক্রেতা ও গ্রাহকদের প্রতি আস্থার ভিত্তি মজবুত করবে।

আপনার কোম্পানির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনায় প্রণোদিত হলে ক্রেতা ও বিনিয়োগকারী আপনাকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করবে। একই প্রোডাক্ট অনেকেই বিক্রি করতে পারে কিন্তু আপনার প্রোডাক্ট অক্ষত অবস্থায় ডেলিভারির নিশ্চয়তা, সেলস পরবর্তি সার্ভিস প্ল্যান এর স্পষ্ট সমাধান আপনার ব্র্যান্ডকে অন্যান্য ব্যবসায়ী থেকে আলাদা হিসেবে উপস্থাপন করবে। আপনার প্রোডাক্ট এর ‘Unique Selling Proposition’ (USP) বা অনন্য বৈশিষ্ট্য বা ব্যতিক্রমী দিক কি রয়েছে যা অন্যের নেই তা অবশ্যই হাইলাইট করুন। 

ধরুন কোন পণ্য মেনুফ্যাকচারে যে কমন প্রসেস রয়েছে আপনি তার বাইরে বিশেষ কোন উপাদান যোগ করেছেন তা আপনার পণ্যের একটি অনন্য দিক। অথবা এমন কোন প্রোডাক্ট নিয়ে কাজ শুরু করলেন যা দেশে আপনিই প্রথম শুরু করেছেন। আপনার পরে অনেকেই সেই প্রোডাক্ট বাজারজাত করছে। এক্ষেত্রে আপনিই এই প্রোডাক্ট এর পথ প্রদর্শক। সেটাও একটা অনন্যতা প্রকাশ করবে। ব্র্যান্ডিং এর মাধ্যমে এসব ফুটিয়ে তুলতে পারলে সহজেই ক্রেতা আপনার ব্র্যান্ডকে বেছে নিবে।

। দ্বিতীয়ত: রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট ।

রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট

ব্র্যান্ডকে শক্তিশালীকরণ, নতুনত্ব সৃষ্টি, অগ্রগতি এবং ব্যবস্থাপনার জন্য ব্র্যান্ড রিসার্চ এর বিকল্প নাই। ক্রমান্বয়ে ব্যবসাকে প্রতিষ্ঠিতকরণ করেতে কাস্টমার সচেতনতা, উপলব্ধি এবং অভিজ্ঞতা ট্র্যাক করতে ব্র্যান্ড রিসার্চ খুব জরুরী।

এজন্য শক্তিশালী কিছু পদ্ধতি তৈরি করে কাজ করা যেতে পারে। যেমন –

সার্ভে: 

পণ্য ও ব্র্যান্ড সম্পর্কে ভোক্তাদের সামগ্রিক মতামত বুঝতে সমীক্ষা ও জরীপ অনেক পুরনো কিন্তু এখনও দুর্দান্ত একটি পদ্ধতি। ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টের পর্যায় নির্বিশেষে এটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। সার্ভের জন্য বিভিন্ন অনলাইন সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন।

গ্রুপ ফোকাস: 

সকল শ্রেণীর মানুষ কাস্টমার থেকে শুরু করে এমপ্লোয়িদের সহ ওয়ার্কশপ, ক্যাম্পেইন ইত্যাদির মাধ্যমে পণ্য ও ব্র্যান্ড নিয়ে গুণগত অন্তর্দৃষ্টি বোঝা সম্ভব। এখানে খোলামেলা প্রশ্ন উত্তর থেকে আপনার ব্র্যান্ড, পণ্য কোয়ালিটি, কাস্টমার সার্ভিস সম্পর্কে গভীর উপলব্ধি, মতামত এবং প্রতিক্রিয়া পাবে।

এমপ্লোয়ি রিপোর্ট:

ব্র্যান্ডের সম্ভাবনা, কাস্টমারের ভাবনা জানতে এমপ্লোয়িদের মূল্যায়ন পেশ করা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোম্পানির বিক্রয়কর্মী, অ্যাকাউন্ট ম্যানেজার, শপ ম্যানেজার এবং বিক্রয় প্রতিনিধিরা কাস্টমারকে নিয়মিত ফেস করে। তারা প্রতিনিয়ত কাস্টমারদের চাওয়া এবং আপনার ব্র্যান্ড নিয়ে তাদের ভাবনাগুলো সামনে থেকে জানতে পারে। এমপ্লোয়িদের কাছ থেকে পাওয়া এসব গল্পগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ ও গুণগত রিসার্চ আপনার ব্র্যান্ড ডেভেলপমেন্টে খুব কাজে দেবে।

সোশ্যাল ইন্টিলিজেন্স:

রিসার্চের একটি অনন্য সমন্বয় সোশ্যাল ইন্টিলিজেন্স। এর সঠিক প্রয়োগ গুণগত সমষ্টিগত ভাল ফল দিতে পারে। সোশ্যাল ইন্টিলিজেন্স এমন একটি কৌশলগত জ্ঞান বা দক্ষতা যা ভিন্ন পরিস্থিতি এবং সামাজিক গতিশীলতা সম্পর্কে সচেতনতা অর্জনে সহায়তা করতে পারে। এটি উল্লেখ করে আপনি নির্দিষ্ট প্রশ্নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন বরং কাস্টমার, ফলোয়ারদের সর্বোত্তম ও বুদ্ধিদীপ্ত উত্তর দেওয়ার জন্য  প্রস্তুত। সেই সাথে তারা যে সমস্ত ডায়ালগ প্রত্যাশা করেন না সেসব দিকগুলো খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।

এক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়া মেট্রিক্স একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি ব্যবসার গভীর অন্তর্দৃষ্টি পেতে। ট্যাগ এবং ক্যাটাগরি ভিত্তিক ডেটা সেগমেন্ট করা এবং ডেটাতে প্রাসঙ্গিক তথ্য হাইলাইট করে এটা ব্যবহার করা যায়। 

কমপিটিটিভ বা প্রতিযোগিতামূলক রিসার্চ: 

প্রতিযোগী ব্র্যান্ডগুলো নিয়ে রিসার্চ করুন। তাদের ব্র্যান্ডিং অবস্থান ও কৌশল সম্বন্ধে জানুন এবং উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। তাদের শক্তিমত্তা এবং দুর্বলতাগুলি উন্মোচন করতে চেষ্টা করুন। কাস্টমারের চোখে তাদের ইউনিক সেলিং পয়েন্টকে বিবেচনায় নিন। প্রতিযোগীদের একটি ওভারভিউ পেতে এমন  বিশ্লেষণের উদ্যোগ আপনার নিজস্ব পণ্য ও সার্ভিস এ ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সাহায্য করবে।

ব্র্যান্ড অ্যাওয়ারনেস:

মানুষজন কী আপনার ব্র্যান্ড সম্পর্কে সচেতন? আপনার ব্র্যান্ড কী ভোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব করে? তারা কী আপনার ব্র্যান্ড ও পণ্যের ব্যাপারে অনুপ্রাণিত নাকি অপ্ররোচিত? এসব নিয়েও দরকার আছে রিসার্চ। ব্র্যান্ড সচেতনতা পরিমাপের জন্য ফোকাস গ্রুপগুলিতে আপনার ব্র্যান্ড যে খ্যাতি অর্জন করেছে বা যে লক্ষ্য নিয়ে আগাচ্ছে সেসবের প্রচারণার কাজে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত একত্রিত করা জরুরী।

। তৃতীয়ত: টার্গেট অডিয়েন্স ।

টার্গেট অডিয়েন্স

আপনার টার্গেট গ্রুপ কারা তা নির্ধারণ করুন। যাদের আপনি ক্রেতা হিসেবে পেতে চান এবং যারা ইতিমধ্যে আপনার ক্রেতা তাদের ডেমোগ্রাফিক ডাটা, পছন্দ, অপছন্দ নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন এবং একটি বায়ার পারসোনা নির্ধারণ করুন। যেখানে কাস্টমারদের ভিন্ন ভিন্ন ক্যাটাগরিতে বিশ্লেষণ করা যায়। যেমন তাদের বয়স সীমা, জেন্ডার, পারিবারিক ও আর্থিক অবস্থান, বাসস্থান, পেশা, শপিং হেবিট, মিডিয়া হেবিট ইত্যাদির ডাটাবেজ এবং তার এনালাইসিস থাকতে হবে।

অর্থাৎ একটি যথাযথ বায়ার পারসোনা তৈরি করতে আপনার অডিয়েন্স এর স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার। আর এই বায়ার পারসোনা আপনার পণ্যের বিজ্ঞাপন এবং ব্র্যান্ড প্রচারণাকে সহজে অডিয়েন্সের কাছে পৌঁছাতে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করবে।

আপনার টার্গেট অডিয়েন্স সহজে পেতে শক্তিশালী কিছু টুলস ব্যবহার করতে পারেন। সেরকম উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ফেসবুক এর ‘Audience Insights’ এর কথা। এটি সাধারণ ফেসবুক ইউজার এবং আপনার পেজের ফলোয়ারদের সম্পর্কে তুলনামূলক তথ্য দেয়। এই কম্পারেটিভ ডেটা এনালাইসিস থেকে আপনার বর্তমান অডিয়েন্সদের অনুরুপ আরো নতুন নতুন অডিয়েন্স তৈরি করতে পারবেন।

আপনার টার্গেট অডিয়েন্স বা বায়ার পারসোনা নির্ধারণ হলে সেটা সংরক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটা আপনার ব্র্যান্ড এর জন্য মূল্যবান অ্যাসেট। এটা সংরক্ষণের জন্যও Ad Manager সহ অনেক টুলস ব্যবহার করতে পারেন। এটার মাধ্যমে যেকোনো সময় টার্গেট অডিয়েন্সকে আপনার পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখাতে পারবেন।

এছাড়া টার্গেট অডিয়েন্স সনাক্ত করতে পিপিসি (PPC) বা ক্লিক ভিত্তিক বিজ্ঞাপন সহ গুগল অ্যানালিটিকস, টুইটার বিজনেস অ্যানালিটিকস, লিংকডইন অডিয়েন্স ইনসাইটস, এফিনিটি অডিয়েন্স, ডিসপ্লে টার্গেটিং এর মত বিভিন্ন রিসার্চ টুলস অ্যাপ্লাই করতে পারেন।

এতে আপনার সময় ও টাকার সাশ্রয় হবে এবং ব্যাবসা দ্রুত অগ্রসর হবে। কারণ আপনি যখন কাস্টমার নির্ধারিত করে ফেলবেন তখন প্রয়োজনের বাড়তি প্রোডাকশন খরচ কমে যাবে।

। চতুর্থত: ব্র্যান্ড পারসোনালিটি ।

রিসার্চ এন্ড ডেভেলপমেন্ট

আপনার ব্র্যান্ডের একটি পারসোনালিটি আছে – উদাহরণস্বরূপ হালকা মেজাজের না সিরিয়াস; গতানুগতিক না আধুনিক; ইত্যাদি। ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনে যেন এই পারসোনালিটি উঠে আসে এবং সেটা যেন বজায় থাকে। ব্যবসায়ের পক্ষ থেকে কোনো কিছু লেখা বা ছবি, ডিজাইন, প্যাকেজিং – সব কিছুই ব্র্যান্ড কমিউনিকেশনের অংশ। একেকবার একেকরকম পারসোনালিটির কমিউনিকেশন গেলে ব্র্যান্ড ইমেইজ তৈরি হতে পারে না।

একটি কোম্পানির ব্র্যান্ড পারসোনালিটি সুনির্দিষ্ট ভোক্তা সাধারণে আবেগপূর্ণ প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে যা কোম্পানির ইতিবাচক কর্মগুলিকে উপস্থাপন করে। আর কাস্টমার সেই ব্র্যান্ডের প্রোডাক্ট কিনতে চায় যার পারসোনালিটি তার নিজের মত হয়।

ধরুন, আপনার একটি তৈরি পোশাক কারখানা আছে। আপনি কমপ্লাইন্স এর এনভারনমেন্টাল কোড অফ কন্ডাক্ট মেনে গার্মেন্ট প্রোডাকশন করে থাকেন। অর্থাৎ আপনি প্রোডাকশন এর বর্জ্য ও ক্ষতিকর ক্যামিকেল যুক্ত পানি পরিশোধিত না করে নদীতে বা খোলা স্থানে ফেলেন না। তার মানে আপনি একজন পরিবেশ বান্ধব মেনুফ্যাকচারার। এই চর্চাটা যখন মানুষ জানবে তাদের মাঝে যারা পরিবেশ সচেতন ব্যক্তি তারা একই কোয়ালিটির অন্য ব্র্যান্ড এর প্রোডাক্ট না নিয়ে সে আপনার ব্র্যান্ড কিনতে উদ্বুদ্ধ হবে। কারণ পরিবেশ দূষণ তাকে ভাবায় আর আপনি পরিবেশ রক্ষা করে ব্যাবসা করার চেষ্টা করেন। সেইম পারসোনালিটি হওয়ায় সেই কাস্টমারের সাপোর্ট আপনার ব্র্যান্ড পাবে।    

তাই বাজারে আপনার ব্র্যান্ড পারসোনালিটি ও মনোভাবকে সংজ্ঞায়িত করুন যাতে উপযুক্ত ক্রেতা, ভোক্তারা পণ্য কিনতে অনুপ্রাণিত হয়। তাছাড়া একটি ব্র্যান্ড পারসোনালিটির ফলে ব্র্যান্ড ইক্যুইটি বৃদ্ধি পায়।  আর যেকোনো সফল মার্কেটিং ক্যাম্পেইনের জন্য ব্র্যান্ড পারসোনালিটি অন্যতম ফ্যাক্টর।

। পঞ্চমত: ব্র্যান্ড রেপুটেশন ।

ব্র্যান্ড রেপুটেশন

ব্র্যান্ড স্টোরিকে বিকশিত করুণ। প্রতিটি ভাল ব্র্যান্ডের পেছনে একটি গল্প এবং ধারাবাহিক কিছু বার্তা থাকে। প্রতিষ্ঠার পেছনে অনুপ্রেরণা, দিকনির্দেশনার দর্শন, ভ্যালুস এর প্রতিফলন নিয়ে আপনার যাত্রার গল্পের আবেগ মার্কেটে একটি ভিন্ন ধারণার জন্ম দেবে।

তারা যা বলে তা সত্য; এমন  বার্তা ক্রেতার মনে ছড়াবে।

মনে করুন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কোন ব্যক্তি বা সংগঠনের সাথে শীতার্তদের শীত বস্ত্র বিতরণে গিয়েছেন। সেখানে তাদের নিদারুণ কষ্টের জীবন আপনাকে আহত করেছে। সেখানকার উদ্যমী কয়েকজনকে নিয়ে আপনি উদ্যোগ নিলেন আমরা এমন কোন সামাজিক ব্যাবসা প্রতিষ্ঠা করি যেখান থেকে আর্থিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি সমাজের সুবিধাবঞ্চিতরা উপকৃত হয়। সেই ভাবনা থেকে কোন প্রত্যন্ত অঞ্চলে সীমিত পরিসরে গড়ে তুললেন একটি কম্বল কারখানা। এই কারখানা গড়ে ওঠার উপলক্ষ্য ছিল একটি সেবামূলক কর্মকান্ড আর গড়ে তোলার উদ্দেশ্য গ্রামের খুব রিমোট এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান এবং কম খরচে গরিব মানুষের হাতে কম্বল পৌঁছানো।

কোন স্বেচ্ছাসেবীরা যখন এমন উদ্যোগ থেকে একটি ব্যাবসা দাড় করায় তখন খুব সাধারণ ভাবেই সচেতন ক্রেতা মহলে একটি ইতিবাচক মনোভাব বিরাজ করবে। তারা বাড়তি আস্থা থেকে প্রত্যাশা করবে যে তারা ব্যবসাকে শুধু মুনাফা না বরং সেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

। ষষ্ঠ: ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি ।

অবশ্যই ভিজুয়্যাল আইডেন্টিটি তৈরি করুণ। যাতে ব্র্যান্ড এর গল্প, মূলনীতি, উদ্দেশ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। সেটা হতে পারে বিজনেস কার্ড, লোগো, ওয়েবসাইট ইত্যাদির মাধ্যমেও।

যাতে মানুষ আপনার ব্র্যান্ডের আইকনিক স্বতন্ত্রতা দেখে খুব সহজেই পণ্যগুলো চিনতে পারে। যেমন – ফেসবুক বা ইউটিউব এ ভিডিও রাখলে কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যেকোনো কাজে স্পষ্টভাবে লোগো ও অন্যান্য শনাক্তকারী ব্র্যান্ড উপাদান প্রদর্শন করুন।

একটি শক্তিশালী ব্র্যান্ড আইডেন্টিটির প্রভাব বোঝার জন্য অ্যাপল যেভাবে মার্কেটিং ব্যবহার করে তা বিবেচনা করুন। অ্যাপলের ব্র্যান্ড বার্তাটি সিমপ্লিসিটি এবং ইউজার এক্সপেরিয়েন্সকে ফোকাস করে। এর সিম্পল কিন্তু স্বতন্ত্র লোগো, রিটেইলারদের অভিজ্ঞতা, ইউজার ফ্রেন্ডলি ইন্টারফেস এবং সমস্ত মার্কেটিং এবং ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে প্রতিফলিত হয় এই বার্তাটি।

শক্তিশালী ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি নির্দেশ করে এমন আরেকটি কোম্পানির উদাহরণ হল কোকা-কোলা। কোকা-কোলা ব্র্যান্ডের লাল এবং সাদা আইকনিক লোগো বা স্বতন্ত্র আকৃতির গ্লাস বোতলটি মানুষ দেখলে সহজেই পণ্যটিকে চিনতে পারে। ব্র্যান্ডটির বেশ কয়েকটি সুপরিচিত ট্যাগলাইন যেমন ১৯৭৯ এর “Have a Coke and a Smile” এবং ২০১৬ এর “Test the Feeling” বছরের পর বছর ধরে মানুষ গ্রহণ করেছে।

ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি হল কাস্টমারের কাছে আপনার ব্র্যান্ডকে তুলে ধরার জন্য কোম্পানির ভিজ্যুয়াল এলিমেন্টস এর সংগ্রহশালা। এই সংগ্রহশালা আপনার বিদ্যমান এবং সম্ভাব্য উভয় কাস্টমারের সামগ্রিক উপলব্ধি গঠনে একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করবে।

। সপ্তমত: ব্র্যান্ডকে একীভূত করা।

ব্র্যান্ডকে একীভূত করা

বিজনেসে ব্র্যান্ডকে সমন্বিত করুন। অর্থাৎ ব্যবসার প্রতিটা দিক আপনার ব্র্যান্ডে যেন প্রতিফলিত হয়। সেটা হতে পারে অনলাইন উপস্থিতিতে, খুচরা দোকান, কাষ্টমার কেয়ার ও সার্ভিস এর মাধ্যমে। যখনই কাস্টমার আপনার ব্যাবসা সম্পর্কে কিছু পড়বে, শুনবে বা দেখবে তখনই ব্র্যান্ডটি দৃশ্যমান থাকা উচিত৷ উদাহরণ স্বরূপ আপনি ফেসবুক বা ইউটিউব এ যে কোনো ভিডিও রাখলে স্পষ্টভাবে আপনার লোগো এবং অন্যান্য শনাক্তযোগ্য ব্র্যান্ড এলিমেন্ট প্রদর্শন করুন। টুইটার, ফেসবুক এর মতো সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে যে কোনও প্রোফাইল তৈরি করলে তার ক্ষেত্রেও একই কথা। ব্যবসায়িক কার্ড, প্যাকেজিং এবং পণ্যে আপনার লোগো এবং কোম্পানির নাম অন্তর্ভুক্ত করুন।

আপনার কর্মীরাও আপনার ব্র্যান্ড মার্কেটিংয়ে একটি অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করতে পারে। কর্মীদের ব্র্যান্ড প্রশিক্ষণ প্রদান করা এবং নতুন কর্মচারীর জন্য প্রশিক্ষণ সেশনে এই ধরনের প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা একটি ভাল ধারণা।

ব্রান্ডিং এর সমস্ত পদক্ষেপগুলো সম্পন্ন করার পরে তার চূড়ান্ত বাস্তবায়নের জন্য আপনার ব্যবসার সাথে ব্র্যান্ডকে একীভূত করতে হবে। এই একীভূতকরণ সামঞ্জস্যপূর্ণ বার্তা প্রচার করতে পারে এবং ধারাবাহিকতা রক্ষা করে। ব্র্যান্ডের স্বীকৃতিকে মজবুত করে।  ভোক্তাদের আস্থাকে আরও শক্তিশালী করে। 

তাই অডিয়েন্স আপনার ব্র্যান্ড এর প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে এবং আস্থা স্থাপন করে ব্র্যান্ড নির্বাচন করতে এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি কতটা কার্যকর ভাবে ব্যবসাকে ব্রান্ডে স্বমন্বিত করতে পারছেন।

শেষ কথা

ব্র্যান্ডিং নিয়ে কাজ করা একটি  দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। এর জন্য অনেক পরিকল্পনা এবং চিন্তার প্রয়োজন। রাতারাতি কখনও সফলতা আসে না। অপরিকল্পিত ও লক্ষ্যভ্রষ্ট পদক্ষেপেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসবে না। একটি সফল ব্র্যান্ডি এর জন্য দরকার মেধা, অধ্যাবসায় ও পরিশ্রমের স্বমন্বয়ে উপযুক্ত কৌশল অবলম্বন করে অগ্রসর হওয়া। সেই ব্র্যান্ডি এ বিশ্বাস, স্বীকৃতি, বিশ্বস্ততা এবং খ্যাতি তৈরির মাধ্যমে ব্যবসায় দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসই ফলাফল পাবেন আপনি।