কোনো ব্যাবসা বেশ সফল হয়েছে, সেটা কীভাবে বুঝবেন? খুব সহজ, যখন কোনো ব্যবসায় প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জিত হবে শুধুমাত্র তখনই সে ব্যবসাটা সফল ভাবে চলবে। কারণ, আপনি যে প্রোডাক্টটা বিক্রি করছেন মার্কেটে সে প্রোডাক্টের চাহিদা রয়েছে এবং প্রোডাক্টটি মার্কেটের অন্য বিকল্পগুলো থেকে ভালো। 

কিন্তু কীভাবে বুঝবেন আপনার প্রোডাক্ট বা আইডিয়াটি মার্কেট ফিট অর্জন করেছে? এটা জানার আগে প্রোডাক্ট ডিমান্ড কী তা বুঝতে হবে।

প্রোডাক্ট ডিমান্ড কী?

প্রোডাক্ট বা মার্কেট ডিমান্ড হচ্ছে এমন একটি অবস্থা যখন মানুষের কাছে একটি প্রোডাক্টের অনেক চাহিদা থাকে। এই চাহিদা বেশ কিছু বিষয়ের উপর নির্ভরশীল, যেমন – কতজন মানুষ পণ্যটি কিনতে আগ্রহী, কত টাকা দিয়ে কিনতে আগ্রহী ও পণ্যটির যোগান কেমন।

সাধারণত, কোনো প্রোডাক্টের চাহিদা বেড়ে যাওয়া মানে সীমিত সংখ্যক প্রোডাক্ট অধিক সংখ্যক মানুষ কিনতে আগ্রহী হওয়া। যার ফলে পণ্যটির দাম বেড়ে যায় এবং সে দামেই ক্রেতা পণ্যটি কিনতে আগ্রহী হয়। 

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট কী? 

কোনো উদ্যোক্তা যখন মার্কেটের প্রয়োজন কিংবা চাহিদা বের করে সেটার সমাধান করতে সক্ষম হয়, যা ক্রেতা কিনতে রাজি থাকে সেটাকে প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট বলা হয়। বিষয়টি খুব সহজ মনে হলেও এখানে এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যে আপনার পণ্যটি যাতে মানুষের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়।

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট সম্পর্কে স্টার্টআপ কোচ এবং ইনভেস্টর Marc Andreessen বলেন,

“প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট মানে হচ্ছে, একটি ভালো মার্কেটে এমন একটি পণ্য নিয়ে টিকে থাকা যা মানুষকে সন্তুষ্ট করে।” Startup এর দুনিয়ায় কোনো কোম্পানি যখন প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করতে সক্ষম হয় তখন ধারণা করে নেওয়া হয় সে কোম্পানি ভবিষ্যতে সফল হবে। অর্থাৎ সফলতার চাবিকাঠি বা পরিমাপক হিসেবে প্রোডাক্ট মার্কেট ফিটকে ধারণা করা হয়। 

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট কেনো গুরুত্বপূর্ণ? 

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট হচ্ছে ব্যবসার এমন একটি বিষয় যার মাধ্যমে আপনি বুঝতে পারবেন আপনার ব্যবসাটা আপনাকে সফলতা এনে দিবে কি না? প্রত্যেকটি স্টার্টআপ এর প্রমোশোনের আগেই এটি যাচাই করে নেওয়া উচিত যে তার পণ্যটি কাস্টমারের চাহিদা পূরণ করছে কি না। নতুবা আপনার পুরো ইনভেস্টমেন্টই বিফলে যাবে! একটি নতুন প্রোডাক্ট লঞ্চ করার পূর্বে প্রতিটা ব্যবসায়ী আগে দেখে তার এই প্রোডাক্টের কাস্টমার ডিমান্ড কেমন? তখন কাস্টমারও দেখে এই প্রোডাক্টটি তার চাহিদা পূরণ করছে কি না, যদি প্রোডাক্টটি কাস্টমারের চাহিদা পূরণ করে তবেই সেটি প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করতে সক্ষম হয়। বেশীরভাগ স্টার্টআপ ব্যর্থ হওয়ার একটি কারণ হচ্ছে হয়তো তাদের প্রোডাক্ট কাস্টমারের চাহিদা পূরণ কর‍তে সক্ষম নয় কিংবা টার্গেট মার্কেটে সেটি ভ্যালু ক্রিয়েট করতে পারে নি। তাই সফল হতে হলে প্রতিটি স্টার্টআপ এর প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ।  

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট পিরামিড 

প্রতিটি স্টার্টআপ এর কিছু ধাপ অতিক্রম করতে হয়, প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করার জন্য। চলুন সে ধাপগুলো অতিক্রম করি –


ছবি : প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট পিরামিড


আপনার টার্গেট অডিয়েন্স খুঁজুন 

এটি প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। আপনি যখন আপনার প্রোডাক্টের সঠিক টার্গেট কাস্টমার পেয়ে যাবেন, তখন আপনার জন্য প্রোডাক্টের মার্কেট ফিট অর্জন করাও সহজ হবে। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি মেয়েদের পোশাক নিয়ে কাজ করছেন, তাহলে আপনার টার্গেট কাস্টমার মহিলারা। তবে এই মহিলাদের মধ্যে দেখতে হবে, আপনার প্রোডাক্ট ক্যাটাগরি কী ধরণের? এটি কি টিনএজ মেয়েদের জন্য নাকি বড়দের জন্য? সেভাবে আপনি আপনার টার্গেট অডিয়েন্স খুঁজে বের করবেন। আপনি যত বেশী কাস্টমার রিসার্চ করবেন তত ডিটেইল্ড ডেমোগ্রাফি আপনি পাবেন। যা আপনার প্রোডাক্ট প্রমোশোন ও মার্কেট ফিট অর্জন করতে বিশেষ সুবিধা দিবে।

টার্গেট অডিয়েন্স, আপনার প্রোডাক্টের কোয়ালিটি ভালো করতেও বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।

কাস্টমারের চাহিদাগুলো খুঁজে বের করুন

আপনার প্রোডাক্টটি যে সবসময় মার্কেটে “ব্র‍্যান্ড নিউ প্রোডাক্ট” হবে ব্যাপারটি এমন না ও হতে পারে, সেক্ষেত্রে আপনার প্রোডাক্টের ভ্যালু তৈরী করতে হবে মার্কেটে। যখন আপনি একজন নবীন উদ্যোক্তা তখন  প্রথম কাজ হচ্ছে, কাস্টমার আপনার প্রোডাক্ট কেন নেবে সেটার কারণ তুলে ধরা। খেয়াল রাখবেন মার্কেটে আরো অনেক অপশন রয়েছে। এক্ষেত্রে কাস্টমারদের সাথে কথা বলুন, তাদের থেকে জানার চেষ্টা করুন, আপনার কম্পিটিটরেদের প্রোডাক্টের কোন ঘাটতিটি কাস্টমারের চাহিদা পূরণ করছে না এবং আপনি সেই ঘাটতিটি নিয়ে কাজ করুন। অথবা কাস্টমারকে ২৪/৭ কাস্টমার সার্ভিস দিন কিংবা এক্সচেন্জ বা রিফান্ড অপশন দিন। 

মিনিমাম ভায়াবল প্রোডাক্ট তৈরী করুন (MVP) 

MVP (Minimum Viable Product) বা মিনিমাম ভায়াবল প্রোডাক্ট হচ্ছে, এমন একটি প্রোডাক্ট যেটার কাস্টমারের চাহিদা পূরণ করার বেসিক ফিচারগুলো থাকে। 

যেমন – ল্যান্ড ফোনের সাথে তুলনা করলে একটা মোবাইল ফোনের MVP তে ছিল এমন একটা ফোন তৈরি করা যেটা দিয়ে তার ছাড়াই কথা বলা যায়। এরপর এতে নতুন নতুন ফিচার যুক্ত হলো যেমন – কোনো একটা স্ক্রিনে ডায়ালড নাম্বার দেখতে পাওয়া। এরপর নাম্বার সেভ করতে পারা। এরপর আস্তে আস্তে আরো ভ্যালু অ্যাডেড ফিচার যুক্ত হলো যেমন – অ্যালার্ম দিতে পারা। 

এমভিপির মূল কাজ হচ্ছে কাস্টমারকে আকর্ষণ করা, তাদের ফিডব্যাক নেওয়া এবং সে অনুযায়ী প্রোডাক্ট ডিজাইনের কাজ এগিয়ে নেওয়া। অনেক বেশি ফিচার বা ফিনিশিং না থাকার কারণে, এটি ব্যবসায়ীদের খরচ কমায় এবং দ্রুত মার্কেট সার্ভে করতে সাহায্য করে।  

MVP যাচাই করুন


আপনার টার্গেট অডিয়েন্সকে আপনার MVP – টি যাচাই করতে দিন। কাস্টমার ফিডব্যাকের জন্য অবশ্যই সার্ভে করুন, বিভিন্ন প্রশ্ন করুন যার মাধ্যমে আপনার প্রোডাক্ট সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য পাবেন। অডিয়েন্সকে জিজ্ঞেস করুন কীভাবে আপনার প্রোডাক্টটি তাদের সমস্যা সমাধান করেছে, ব্যবহার করতে গিয়ে কি কি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে, কীভাবে সেটা ইমপ্রুভ করা যেতে পারে? ইত্যাদি। মূল কথা হচ্ছে, আপনার প্রোডাক্ট যাচাই করার জন্য কাস্টমারের সাথে কথা বলুন।

Minimum Viable Product (MVP)

ব্যবসায়ীরা মার্কেটে ফাইনাল প্রোডাক্ট ছাড়ার পূর্বে এক প্রকার প্রটোটাইপ মার্কেটে নিয়ে আসে, যা মূল প্রোডাক্টের ন্যায় আচরণ করে। যার মাধ্যমে তারা কাস্টমার ফিডব্যাক এবং পণ্যের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা রাখতে পারে। এটাকে অনেকে পাইলট প্রজেক্ট বলে থাকে। এই ধাপটি যদি ভালো কিছু নিয়ে আসে তাহলে ফাইনাল প্রোডাক্ট মার্কেটে নিয়ে আসা হয়। যার ফলে, সময় এবং অর্থ কোনটাই বৃথা যায় না।

যারা তথ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে জ্ঞান রাখেন, তারা দেখবেন জায়েন্ট কোম্পানীগুলো মার্কেটে নতুন কিছু আনয়নের পূর্বে ‘বেটা’ ভার্সন নিয়ে আসে। যার ফলে, প্রোডাক্ট ও কাস্টমারের চাহিদার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে আগে থেকেই স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়।

প্রোডাক্ট লঞ্চ করুন

আপনি যদি উপরের সবগুলো ধাপ সঠিকভাবে অতিক্রম করে থাকেন এবার আপনার কাজ হচ্ছে, সকল তথ্যের ভিত্তিতে প্রোডাক্টটি লঞ্চ করা। প্রমোশোনাল চ্যানেলগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রমোশোন করুন। প্রমোশোনের মাধ্যমে আপনি আরো বেশী অডিয়েন্সের কাছে রিচ করতে পারবেন। অবশ্যই অডিয়েন্স ফিডব্যাক নিতে ভুলবেন না, কারণ অডিয়েন্স জানে তাদের কোন সমস্যাটা সমাধান  করা প্রয়োজন। 

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট কীভাবে পরিমাপ করবেন?

এবার যেহেতু আপনি জানেন কীভাবে প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করতে হবে তাই এখন আপনার জানতে হবে, কীভাবে আপনি বুঝবেন আপনার প্রোডাক্টটি মার্কেট ফিট অর্জন করেছে? অর্থাৎ পরিমাপ কীভাবে করবেন? 

চিন্তা নেই, এরজন্যও রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এখানে আমরা ২ টি পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করবো।

কাস্টমার ফিডব্যাক

যেসব কোম্পানি তাদের ভোক্তার সমস্যাগুলো সমাধান করে তারা খুব দ্রুতই প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করতে সক্ষম হবে। সপ্তাহে কিংবা অন্তত মাসে একবার কাস্টমার রিভিউ নেওয়া প্রয়োজন। এর জন্য সবচেয়ে ইফেক্টিভ পদ্ধতি হলো ইন্টারভিউ নেওয়া। এটা হতে পারে সরাসরি ফোন কলের মাধ্যমে কিংবা ভিডিও কনফারেন্সে। প্রোডাক্ট টিমের উচিত প্রতি সপ্তাহে ক্রেতার সাথে যোগাযোগ করা ও তাদের মতামত নেওয়া। 

ক্রেতাকে যে প্রশ্নটি করতে হবে – আপনি কি এই প্রোডাক্ট ব্যবহার করে সন্তুষ্ট? 

অথবা, এই প্রোডাক্ট যদি আর না থাকে আপনার কি কোনো অসুবিধা হবে? 

যা গুরুত্বপূর্ণ তা পরিমাপ করুন

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট পরিমাপ করার জন্য কাস্টমার ফিডব্যাক নেওয়ার পাশাপাশি আপনার আরো কিছু কোয়ানটিটেটিভ তথ্য দরকার। এক্ষেত্রে আপনি AARRR Framework টি ব্যবহার করতে পারেন। এই ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে আপনি যে বিষয়গুলো বুঝতে পারবেন –

অ্যাকুইজিশন বা অর্জন – আপনাকে কীভাবে ক্রেতারা খুঁজে পাচ্ছে? 

অ্যাক্টিভেশন বা সক্রিয়করণ – ক্রেতাদের প্রথম অভিজ্ঞতা কেমন?

রিটেনশন বা ফিরে আসা – কতজন ক্রেতা নিয়মিত আপনার পণ্য ব্যবহার করছে?

রেভেনিউ বা আয় – তারা কি আপনার পণ্য বা সার্ভিসের জন্য অর্থ ব্যয় করছে?

রেফার – তারা কি অন্যদের আপনার পণ্য কেনার জন্য রেকমেন্ড করছে? 

যদি ক্রেতাদের ফিরে আসার হার বেশী হয় তবে আপনার প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করার সম্ভাবনা অনেক বেশী। যদি নেগেটিভ ফিডব্যাকের হার ২০% এর কম হয় তবেও আপনার প্রোডাক্ট মার্কেট অর্জন হবে খুব শীঘ্রই। 

যারা টেক স্টার্টাপ তারা মাথায় রাখবেন, আপনার অ্যাপ ৫০ লক্ষ মানুষ ডাউনলোড করা মানেই কিন্তু তারা সবাই আপনার ইউজার না। এজন্য ইউজারদের সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে যাচাই করুন।

মানুষ আপনার পণ্য পছন্দ করে

কাস্টমারের উপর আপনার পণ্যের ইমোশোনাল প্রভাব আছে নাকি এটা পরিমাপ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এতে করে আপনার পণ্য তারা পছন্দ করছে কি না সেটা পরিমাপ করা সহজ হয়ে যায়। আর এর জন্য আপনার কোম্পানির Net Promoter Score পরিমাপ করা যেতে পারে। NPS হচ্ছে এমন একটি পদ্ধতি যেটা দিয়ে কাস্টমারের কোম্পানির প্রতি সন্তুষ্টি ও লয়্যালিটি পরিমাপ করা যায়। ছোট্ট একটি প্রশ্নের মাধ্যমে এটি আরো সহজ হয়, “আমার পণ্যটি আপনি কি আপনার পরিবার অথবা বন্ধুদের মধ্যে রেকমেন্ড করবেন?” এই পদ্ধতিটি পুরো পৃথিবীর প্রায় সকল কোম্পানি এখন ব্যবহার করে আসছে।

NPS পরিমাপের পরে একটি বিষয় খেয়াল রাখা প্রয়োজন যে কেন আপনার পণ্য কাস্টমার অন্যদের কাছে সাজেস্ট করছে? বা কেন করছে না? 

আপনি যদি নিয়মিত NPS পরিমাপ করেন তবে একটি প্রশ্ন আপনার জন্য বেশ কার্যকরী হতে পারে, তা হলো “কোন বিষয়টি আপনাকে আমাদের প্রোডাক্ট অন্যকে রেকমেন্ড করতে আগ্রহী করবে?” 

টার্গেট করুন তাদের যারা আপনার প্রমোটার নয় এবং বোঝার চেষ্টা করুন কোন বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করছে।

আপনার কাস্টমার অর্জনের হার লাইফটাইম ভ্যালু থেকে কম

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রিক যা আপনার নিয়মিত পরিমাপ করা প্রয়োজন। নতুন ক্রেতা অর্জন করতে আপনার কোম্পানির কেমন খরচ করতে হচ্ছে? আপনার ক্রেতা অর্জনের জন্য করা খরচকে মোট অর্জিত ক্রেতার সংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে যেটা পাওয়া যাবে সেটাই আপনার কাস্টমার অ্যাকুইজিশন কস্ট বা CAC। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি এক বছরে ১০ হাজার টাকা খরচ করলেন ক্রেতা অর্জনের জন্য, এই ১ বছরে আপনার অর্জিত ক্রেতার সংখ্যা ১০০ জন। তবে আপনার Customer Acquisition Cost (CAC) হলো জনপ্রতি ১০০ টাকা। এখন যদি আপনার কাস্টমার আপনার সার্ভিসের জন্য গড়ে ৫০ টাকা ব্যায় করে, তবে আপনার কাস্টমারের LifeTime Value (LTV) বা লাইফটাইম ভ্যালু হচ্ছে ৫০ টাকা। 

অর্থাৎ, আপনার প্রোডাক্ট থেকে কাস্টমার অর্জনের খরচ পুরোটা উঠছে না, যা থেকে বোঝা যায় আপনার প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জিত হচ্ছে না। আপনার পণ্য বা বিজনেস মডেল সহজে রিপ্লেস করা যাবে।

আপনার বিজনেস কি ইউনিক? আপনার পণ্য বা বিজনেস মডেল সহজে অন্য কেউ কপি করতে পারবে না যদি এমন হয়ে থাকে তবে খুব শীঘ্রই আপনার প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জিত হবে। কারণ, একটি পণ্যের যোগান যখন এক জায়গা থেকেই আসে তখন ক্রেতার ফিরে আসার হার বেড়ে যায়, যদি পণ্যের মান ও কাস্টমার সার্ভিস ভালো হয়। এছাড়া আপনার পণ্যটি যদি প্রয়োজনীয় পণ্য হয় তবেও এটি প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করতে পারবে বলে ধারণা করা যায়।

প্রোডাক্ট স্যাটিসফেকশন  কী? এটি কীভাবে প্রোডাক্ট মার্কেট ফিটের সাথে সম্পৃক্ত? 

প্রোডাক্ট স্যাটিসফেকশন বা সন্তুষ্টি বলতে সাধারণত কোনো কোম্পানির একটি নির্দিষ্ট প্রোডাক্ট এর প্রতি কাস্টমারদের সন্তুষ্টিকে বোঝায়। যেহেতু কাস্টমার কোনো ব্র‍্যান্ডের প্রোডাক্ট ব্যবহার করেই নিজের ফিডব্যাক দিয়ে থাকে, তাই সাধারণত কাস্টমার সন্তুষ্টি নির্ভর করে প্রোডাক্ট সন্তুষ্টির উপর। কোনো প্রোডাক্টের উপর কাস্টমারের সন্তুষ্টির অর্থ হচ্ছে, সেই প্রোডাক্টটি কাস্টমারের সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে চাহিদা পূরণ করছে।

আমরা জানি, প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্থ কোনো প্রোডাক্ট মার্কেটে কাস্টমারের চাহিদা পূরণ করার সক্ষমতা রাখার মাধ্যমে অর্জন করে। তাই প্রোডাক্ট সন্তুষ্টি ও প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত। কোনো প্রোডাক্ট এর প্রতি কাস্টমার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে সে প্রোডাক্ট কাস্টমারের চাহিদা পূরণ করে এবং প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করে। 

উদাহরণ স্বরূপ, আপনি চা পাতার ব্যাবসা করেন। আপনি যে এলাকায় চা পাতার ব্যাবসা করছেন সে এলাকার মানুষ এখন নিয়মিত আপনার চা পাতা খাচ্ছে এবং তারা সকলেই আপনার চা পাতা নিয়ে সন্তুষ্ট। একটা নির্দিষ্ট সময় পর দেখা গেলো তারা অন্য কোনো চা পাতা না খেয়ে আপনার চা পাতাই নিচ্ছে, অর্থাৎ আপনার চা পাতাটি প্রোডাক্ট সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

কাস্টমার বায়িং জার্নি (AIDA Model) :

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জনের জন্য কাস্টমার বায়িং জার্নি জানা জরুরি।  AIDA Model এমন একটি ফ্রেমওয়ার্ক যার দ্বারা আপনার প্রোডাক্ট কাস্টমার কীভাবে কিনছে তা বুঝতে সুবিধা হবে। এটি ৪ টি ধাপের মাধ্যমে তৈরী, প্রতিটি ধাপ কাস্টমার জার্নির ভিন্ন ধাপ রিপ্রেজেন্ট করে।

AIDA Model

অবগতি (Awareness)

অ্যাওয়ারনেস হচ্ছে কাস্টমার জার্নির প্রথম ধাপ। এই পর্যায়ে কাস্টমার আপনার প্রোডাক্ট বা সার্ভিস সম্পর্কে অবগত হয়। এখানে আপনার প্রোডাক্ট সম্পর্কে অডিয়েন্সকে অবগত করার বেশ অনেকগুলো পদ্ধতি রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, আপনি বিভিন্ন পেইড ক্যাম্পেইন করতে পারবেন কিংবা পিআর, বিলবোর্ডের মাধ্যমে অডিয়েন্সকে অবগত করতে পারেন। প্রমোশোনের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি মাথায় রাখা জরুরি তা হলো, আপনার প্রমোশোন সঠিক টার্গেট কাস্টমারের কাছে পৌঁছানো। এবং এটি করার খুব ভালো একটি মাধ্যম হচ্ছে আপনার অডিয়েন্স যেসব চ্যানেল বা সোশাল মাধ্যম ব্যবহার করছে সেগুলোর মাধ্যমে প্রমোশোন করা। 

যেহেতু কাস্টমার অবগতি পিরামিডের প্রথম ধাপ তাই এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অডিয়েন্স যদি আপনার প্রোডাক্ট সম্পর্কে অবগতই না হয় তবে তারা কিনবে কীভাবে?

আগ্রহ (Interest)

আগ্রহ হচ্ছে কাস্টমার জার্নির দ্বিতীয় ধাপ। এই পর্যায়ে অডিয়েন্স আপনার প্রোডাক্ট বা সার্ভিস সম্পর্কে আগ্রহ পোষণ করে। এখানে জেনে রাখা ভালো, অবগত হওয়ার ধাপ থেকে আগ্রহী হওয়া ধাপটি বেশ ভিন্ন। এখন অডিয়েন্স শুধু আপনার প্রোডাক্ট সম্পর্কে জানেই না, তারা আপনার প্রোডাক্টের ব্যাপারে আগ্রহীও হয়।

অডিয়েন্স এর আগ্রহ বাড়াতে আপনাকে বিভিন্ন মার্কেটিং মেথড এপ্লাই করতে হবে। এক্ষেত্রে আপনি কন্টেন্ট মার্কেটিং, সোশাল মিডিয়া মার্কেটিং, ইনফ্লুয়েন্সার মার্কেটিং, ইমেইল মার্কেটিং, গেরিলা মার্কেটিং ইত্যাদি যেকোনো মেথড এপ্লাই করে আপনার প্রোডাক্ট সম্পর্কে অডিয়েন্সকে আগ্রহী করে তুলতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই টার্গেট কাস্টমার এর বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। 

একবার যখন আপনি তাদের আগ্রহী করে তুলতে সক্ষম হবেন তখন আপনার কাজ হচ্ছে, তাদের আপনার কন্টেন্টের সাথে এংগেজড করে রাখা বিভিন্ন মার্কেটিং এর মাধ্যমে।

সিদ্ধান্ত (Desire)

ডিসায়ার বা সিদ্ধান্ত ধাপটি বলতে, অডিয়েন্স আপনার প্রোডাক্ট বা সার্ভিস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটাকে বোঝায়। এই ধাপে পৌঁছাতে আপনার এডভ্যান্স মার্কেটিং টেকনিক কাজে লাগাতে হবে যা অবগত করা এবং আগ্রহী করার ধাপ থেকেও উন্নত হবে। 

উদাহরণ স্বরূপ, আপনি জেনারেশন ক্যাম্পেইন, ওয়েবিনার কিংবা ফ্রি ট্রায়াল মেথড এপ্লাই কর‍তে পারেন। এই ক্যাম্পেইনগুলোর লক্ষ্য হচ্ছে কাস্টমারকে আপনার প্রোডাক্ট কিনতে বা সার্ভিস নিতে পুশ করা। এবং সবশেষে যখন কাস্টমার পার্চেজ সম্পন্ন করবে তখন আপনার কাজ হচ্ছে, কাস্টমার সন্তুষ্টি অর্জন করা যা শুধুমাত্র প্রোডাক্ট কোয়ালিটি ও বেস্ট কাস্টমার সার্ভিস প্রোভাইডের মাধ্যমে সম্ভব। 

কেনা  (Action)

সব ধাপ অতিক্রম করার পর এবার শেষ ধাপ হচ্ছে কিনে ফেলা, যা করবে আপনার কাস্টমার। আপনার প্রোডাক্ট নিয়ে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং তার কাছ থেকে পেমেন্ট নেওয়া এই ধাপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। 

প্রোডাক্ট মার্কেট ফিটের উদাহরণ সমূহ

Uber

Travis Kalanick and Garrett Camp ২০০৯ সালে উবার এর যাত্রা শুরু করে, নেক্সট জেনারেশন রাইড শেয়ারিং সার্ভিস হিসেবে। এখন পুরো বিশ্বে এটি ৭২ টা দেশে প্রায় ১০ হাজারের বেশী শহরে সার্ভিস দিচ্ছে। যার Net Worth এখন ৪২ বিলিয়ন ডলার।

উবার নিজের টার্গেট অডিয়েন্সকে খুব ভালোভাবে বের করতে পেরেছিলো এবং তাদের চাহিদা পূরণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলো। সেসময় একটি ট্যাক্সির জন্য অপেক্ষা করা বেশ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার ছিলো, যা উবার মাত্র একটি ক্লিকের মাধ্যমে ৫ মিনিটের ব্যবধানে নিয়ে এসেছিলো যা অডিয়েন্সকে উবার ব্যবহারে আগ্রহী করে তুলেছে।

উবার তার প্রথম রাইড ২০১০ সালে লঞ্চ করেছিলো এবং এরপর ফান্ডিং কালেক্ট করেছে প্রায় ১.২৫ মিলিয়ন ডলার।

Google

আপনি এই মুহুর্তে যে ব্লগটি পড়ছেন, এটিও এই গুগল সার্চ ইঞ্জিনকে ব্যবহার করেই পড়ছেন। তাই বোঝা গেলো, গুগল সম্পর্কে খুব একটা কথা বলতে হবে না।

Google- খুব ভালোভাবেই আঁচ করতে পেরেছিল এবং বুঝতে পেরেছিল, যে ব্যবসাগুলো তাদের বিজ্ঞাপনগুলো সম্ভাব্য অডিয়েন্সের নিকট অনুসন্ধান পৃষ্ঠার বাইরে প্রদর্শন করার জন্যও অর্থ প্রদান করবে, এবং তারা সেই চাহিদা মেটাতে অ্যাডসেন্স তৈরি করেছে৷ অ্যাডসেন্স ওয়েবপৃষ্ঠাগুলো স্ক্যান করে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাসঙ্গিক বিজ্ঞাপনগুলো ব্যবহারকারীর সামনে প্রদর্শন করে। 

২০১৭ সাল নাগাদ,  AdSense – এর ১১ মিলিয়ন ব্যবহারকারী Google কে বছরে ৯৫ বিলিয়ন অর্থ প্রদান করে।

সবশেষে, প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট হচ্ছে একটি চলমান প্রক্রিয়া। যদি ধারণা করে থাকেন একবার আমার প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করলেই কাজ শেষ তবে আপনার ধারণাটি ভুল। প্রোডাক্ট মার্কেট ফিট অর্জন করা এবং সেটা ধরে রাখাও মার্কেট ফিটেরই অংশ।